গ্রিনল্যান্ড উত্তেজনার জেরে নিম্নমুখী বৈশ্বিক শেয়ারবাজার

ইউরোপের আটটি দেশের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকি এবং এর জেরে দুই পক্ষের প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তি স্থগিতের আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

ইউরোপের আটটি দেশের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকি এবং এর জেরে দুই পক্ষের প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তি স্থগিতের আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ডেনমার্কসহ ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের এ বিরোধ এখন চরম কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ফিউচার মার্কেটে গতকাল কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা গেলেও ইউরোপ ও এশিয়ার অধিকাংশ প্রধান শেয়ারবাজার সূচক ছিল নিম্নমুখী। বিনিয়োগকারীরা এখন দাভোস সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আসন্ন ভাষণের দিকে তাকিয়ে আছেন। এর ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন বিনিয়োগকারীরা। খবর এপি ও রয়টার্স।

স্কটল্যান্ডের টার্নবেরিতে গত জুলাইয়ে স্বাক্ষরিত মার্কিন-ইউরোপীয় বাণিজ্য চুক্তিটি এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক হুমকির পর ইউরোপীয় সংসদ এ চুক্তি স্থগিত করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করছে। প্রভাবশালী ইউরোপীয় নেতাদের মতে, বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এ চুক্তি অনুমোদন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এমন সিদ্ধান্তের খবরে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মার্কিন সম্পদ বিক্রির বা ‘সেল আমেরিকা’ প্রবণতা জোরালো হয়েছে। এর প্রভাবে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক এসঅ্যান্ডপি ৫০০ গত অক্টোবরের পর সবচেয়ে বড় পতনের মুখে পড়ে। সূচকটি এদিন ২ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। এছাড়া ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ ১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং প্রযুক্তিপ্রধান নাসডাক সূচক ২ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন মার্কিন পণ্যের ওপর ৯৩ বিলিয়ন ইউরো সমমূল্যের শুল্ক আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইউরোপীয় বাজারে যেসব কোম্পানি অন্য দেশে পণ্য রফতানি করে, তাদের শেয়ারদরে বড় পতন দেখা গেছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, ওষুধ ও প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলো মার্কিন শুল্কের হুমকিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এর প্রভাবে জার্মানির ডিএএক্স সূচক দশমিক ৪ শতাংশ এবং ফ্রান্সের সিএসি ৪০ সূচক দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। এছাড়া ব্রিটেনের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক ছিল প্রায় অপরিবর্তিত।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় নেতাদের কঠোর অবস্থান এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তিক্ত সম্পর্কের কারণে বড় বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি বাড়িয়ে দিয়েছেন।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের পুঁজিবাজারেও গতকাল অস্থিরতা অব্যাহত ছিল। জাপানের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক নিক্কেই ২২৫ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৫২ হাজার ৭৭৪ পয়েন্টে নেমেছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির ৮ ফেব্রুয়ারি আগাম নির্বাচনের ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে। তাকাইচির কর হ্রাস ও সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভাব্য পরিকল্পনার খবরে জাপানি বন্ডের মুনাফার হার (ইল্ড) রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা শেয়ারবাজারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

এ অঞ্চলের অন্যান্য বাজারের মধ্যে তাইওয়ানের তাইএক্স সূচক ১ দশমিক ৬ শতাংশ ও ভারতের সেনসেক্স দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। তবে হংকংয়ের হ্যাং সেং ও দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে দশমিক ৫ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে বড় বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রকে আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে পারছেন না। ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কনীতি এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির ফলে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে ঝুঁকি এড়াতে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সরিয়ে নিচ্ছেন অনেকে। শেয়ারবাজারের পরিবর্তে নিরাপদ বিনিয়োগের আশায় বড় অংশই এখন বন্ড মার্কেটের দিকে ঝুঁকছেন। মঙ্গলবার জাপানি সরকারি বন্ডের ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় দরপতনের পর গতকাল তা কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড ৫ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা বিনিয়োগকারীদের উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে দিয়েছে। পুঁজিবাজারের ঝুঁকির মাত্রা পরিমাপক সূচক ‘ভিক্স’ দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে, যা বাজারে বিনিয়োগ পরিবেশে বিদ্যমান অস্থিরতায় প্রতিফলন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যে হঠাৎ দেখা দেয়া এ বৈরী পরিবেশে দাভোস সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের মধ্যকার বিভক্তি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ মার্কিন শুল্ক নীতিকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে, মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউরোপকে পাল্টা ব্যবস্থা না নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন এবং তাদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও একই সম্মেলনে মার্কিন কমার্স সেক্রেটারি হাওয়ার্ড লুটনিক বেশ কঠোর সুরে কথা বলেছেন। তিনি সরাসরি দাবি করেছেন যে বিশ্বায়নের ধারণাটিই এখন ব্যর্থ হয়েছে। প্রভাবশালী দেশগুলোর নেতাদের এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও মন্তব্য পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতাকে আরো বড় ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি দাভোস সম্মেলনে তার শুল্ক নীতির বিষয়ে অনড় থাকেন, তবে শেয়ারবাজারের এ নিম্নমুখিতা আরো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বিশেষ করে আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) নীতিনির্ধারণী বৈঠক এবং জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপর পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ অনেকখানি নির্ভর করছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যকার এ বাণিজ্য সংঘাত ও আইনি লড়াইয়ের আশঙ্কা বাজারের স্বাভাবিক গতি ফেরার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও